

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
ফুলবাড়িয়া উপজেলা কি অবৈধ করাতকলের জন্য এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে? ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি টের পেয়েই করাতকল মালিক ও শ্রমিকদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও গভীর ও অস্বস্তিকর করে তুলেছে। প্রশাসন পৌঁছানোর আগেই যদি অপরাধীরা সটকে পড়ে, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে—তথ্য গেল কোথা থেকে, আর কার আশ্রয়ে?
বুধবার বিকেলে উপজেলার কালাদহ ও আছিম বাজার এলাকায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ তাকী তাজওয়ারের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে আটটি অবৈধ করাতকল সিলগালা করা হয়। অভিযানে বনবিভাগের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন রসুলপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মকরুল ইসলাম আকন্দ, উথুরা রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন, সন্তোষপুর বিট অফিসের ডেপুটি রেঞ্জার মোহাম্মদ ইমদাদুল হক এবং এনায়েতপুর বিট অফিসার মুহাম্মদ সেলিম মিয়া।
তবে প্রশ্ন হলো—এই কর্মকর্তারা যখন দিনের পর দিন সংশ্লিষ্ট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন, তখন এতগুলো অবৈধ করাতকল কীভাবে নির্বিঘ্নে পরিচালিত হলো? আটটি করাতকল সিলগালা নিঃসন্দেহে একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ, কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী ফুলবাড়িয়ায় করাতকলের সংখ্যা এই আটটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাহলে বাকি করাতকলগুলো কোথায়, কার নজরদারির আওতায়?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অভিযানের আগেই করাতকল মালিক ও শ্রমিকদের পালিয়ে যাওয়া। এটি স্পষ্টভাবে প্রশাসনিক তৎপরতা আগাম ফাঁস হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এই তথ্য ফাঁসের দায় কার—স্থানীয় পর্যায়ের বনবিভাগ, সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ অফিস, নাকি অন্য কোনো প্রশাসনিক সূত্র? এই প্রশ্নের জবাব না মিললে ভবিষ্যতের সব অভিযানই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
বছরের পর বছর ধরে ফুলবাড়িয়ার বনভূমি উজাড় হচ্ছে, কাঠ পাচার হচ্ছে, পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে—তখন রেঞ্জ অফিস ও বিট অফিসগুলোর ভূমিকা কী ছিল, সেটিও এখন জনস্বার্থে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা যদি অবৈধ করাতকলের অবস্থান জানতেই না পারেন, তবে সেটি চরম ব্যর্থতা; আর যদি জেনেও ব্যবস্থা না নিয়ে থাকেন, তবে সেটি আরও গুরুতর অপরাধ।
পরিবেশ রক্ষা আর বন সংরক্ষণ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অবৈধ করাতকলগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং দায়ী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি নেই।
আজ আটটি করাতকল সিলগালা হয়েছে—কাল আবার খুলবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে সত্যিকারের লড়াই শুরু করতে হলে শুধু মালিক নয়, তাদের নীরব আশ্রয়দাতাদেরও আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। নইলে ফুলবাড়িয়া শুধু বন উজাড়ের নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক হয়েই থেকে যাবে।