

বিনোদন ডেস্কঃ
বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিমান ও বহুমাত্রিক অভিনেতা নারায়ণ চক্রবর্তী।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার বিক্রমপুর অঞ্চলে—বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কোলা ইউনিয়নের মধ্য কোলা গ্রামে। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
১৯৪৪ সালে তিনি মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পড়াশোনার প্রতি তেমন আগ্রহ না থাকায় কলেজে ভর্তি না হয়ে কারিগরি শিক্ষার দিকে ঝোঁকেন। খিদিরপুরের ‘ইন্ডিয়ান অক্সিজেন অ্যান্ড অ্যাসিটাইলিন কোম্পানি’-তে ইলেকট্রিক ও গ্যাস ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শেখেন এবং সেখানে কিছুদিন চাকরি করেন। পরে ‘ফ্রেন্ডস মোটর ওয়ার্কস’-এ যোগ দেন এবং এরপর কলকাতার ‘পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ ডিপার্টমেন্ট’-এ কর্মরত হন। মেট্রিক পরীক্ষার পরপরই পিতার ইচ্ছায় রেখা চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর চাকরির সুবাদে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কুষ্টিয়ায় চলে আসেন। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফুটবল খেলতেন নিয়মিত। কুষ্টিয়া মোহিনী মিলের মালিক কানু চক্রবর্তীর সহায়তায় কুষ্টিয়ার প্রথম বিভাগ ফুটবল দলে টাউন মাঠে খেলার সুযোগ পান।
পরবর্তীতে রাজবাড়িতে বদলি হয়ে রাজবাড়ী রেলওয়ে ক্লাবের বাৎসরিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা’-তে প্রথম অভিনয় করেন। প্রথম অভিনয়েই অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য তিনি রৌপ্য পদকে ভূষিত হন।
এরপর ঢাকায় বদলি হয়ে বাংলাবাজারে বসবাস শুরু করেন। লক্ষ্মীবাজার এলাকায় নিয়মিত মঞ্চনাটকে অংশ নিতে থাকেন। একসময় চট্টগ্রামে বদলি হলে যাত্রাশিল্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে এবং যাত্রানায়িকা পূর্ণিমা সেন গুপ্তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। পুনরায় ঢাকায় ফিরে এসে নাট্যচর্চায় আরও সক্রিয় হন। ধীরে ধীরে নাট্যমহলে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি ঢাকার রেডিওতে নাট্যশিল্পী হিসেবে যুক্ত হন।
এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর ফতেহ লোহানী, নাজীর আহমেদ, আলী মনসুর ও এহতেশামের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘নবারুণ’-এ তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রাভিনয়।
নারায়ণ চক্রবর্তী প্রায় ১৮০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পুরনো বাংলা সিনেমার পর্দায় তাঁর মুখচ্ছবি আজও দর্শকের মনে ভেসে ওঠে। তিনি বিত্তবান পিতা, জমিদার, গ্রামের দরিদ্র স্কুলমাস্টার, বাড়ির পুরনো ভৃত্য—সব ধরনের চরিত্রেই ছিলেন সমান সাবলীল ও বিশ্বাসযোগ্য।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—নীল আকাশের নীচে, কখনো আসেনি, কাঁচের দেয়াল, ঢেউয়ের পর ঢেউ, আপনপর, অবুঝ মন, পিচ ঢালা পথ, তিতাস একটি নদীর নাম, আলোর মিছিল, শহীদ তিতুমীর প্রভৃতি।
বিশেষ করে জহির রায়হান পরিচালিত ‘কখনো আসেনি’ ছবিতে পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে স্মরণীয় হয়ে আছে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য ব্যবসাসফল ও মানসম্পন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অবস্থানকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পুরস্কার না পেলেও তিনি পেয়েছেন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা—আর সেই ভালোবাসাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে যুগের পর যুগ।
১৯৯৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই বলিষ্ঠ ও প্রতিভাবান অভিনেতা আমাদের ছেড়ে চলে যান।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।