


যাপিত জীবনে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ আমরা আমাদের নিজেদেরকে তেজপাতার সমতুল্য মনে করি। তাই প্রায়শই বলে থাকি ‘জীবনটা যেন তেজপাতা হয়ে গেল’। আসলেই কি তাই! যদি জানতাম তেজপাতার অসাধারণ গুণের কথা তবে কখনোই হয়তো এমন কথা বলতাম না। সারা পৃথিবীজুড়েই নানা স্বাদের রান্নায় যুগ যুগ ধরে সঙ্গী হয়ে আসছে তেজপাতা। আর বাঙালি রান্নায় তো তেজপাতা মাস্ট! আর হবে নাই বা কেন! তেজ পাতার তেজে যে অতি সাধারণ পদও হয়ে ওঠে সুস্বাদু, অতুলনীয়। রান্নায় ভিন্ন স্বাদ এনে দিতে,সুঘ্রাণ যোগ করতে মশলা হিসেবেই তেজপাতা ব্যবহার করেন রাঁধুনীরা। সাধারণ ডাল, বিরিয়ানি, পোলাও, পায়েস থেকে শুরু করে অন্যান্য আমিষ রান্নায় ফোড়ন হিসেবে আলাদা মাত্রা যোগ করে তেজপাতার উপস্থিতি। নিরামিষ রান্নাতেও তেজপাতা ব্যবহারের রীতি বহু প্রাচীন। শুধু রান্নার স্বাদ বাড়িয়ে তোলাই নয়, শরীর-স্বাস্থ্য ভাল রাখতেও তেজপাতার তেজস্বী গুণেরজুড়ি মেলা ভার। এতে আছে পটাশিয়াম, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। ইতিহাস ঘাঁটলেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে শুধু এদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই নানা রোগের চিকিৎসায় তেজ পাতার ব্যবহার সেই আদি কাল থেকে হয়ে আসছে। তেজপাতায় বিশেষ এক ধরনের উৎসেচক রয়েছে, যা খাবার হজম করাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া পেটফাঁপা, গ্যাসের সমস্যা নির্মূল করতে পারে তেজপাতা। তেজপাতা শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই টাইপ ২ ডায়াবিটিস রুখতে রান্নায় তেজপাতা ব্যবহার করা ভাল। শরীর থেকে অতিরিক্ত টক্সিন বার করতেও তেজপাতার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তেজপাতা রক্তে শর্করার পরিমাণ কমায়। ত্বকে নানা ধরনের ছত্রাকঘটিত সংক্রমণ হয়। একটি করে তেজপাতা চার কাপ জলে ফুটিয়ে নিয়ে খেতে পারেন। দিনে চার-পাঁচ বার এই জল খেলে সুফল পাবেন। স্নানের জলে মিশিয়ে ব্যবহারও করতে পারেন এটি। সাধারণ ঠান্ডা লাগা বা জ্বর-সর্দি উপশমে দারুণ কাজ করে তেজপাতা। তেজপাতার অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল উপাদান গলায় সংক্রমণজনিত ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে। রক্তে থাকা খারাপ কোলেস্টেরলের জন্যেই স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তেজপাতার মধ্যে থাকা যৌগগুলি কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। তেজপাতা উপকারী কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে থাকে। পাশাপাশি ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে বিভিন্ন হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। তেজপাতা আমাদের অনেক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। চায়ের সাথে তেজপাতা গরম পানিতে ফুটিয়ে তৈরি ক্বাথ ঠাণ্ডা, সর্দি, ফ্লুর মতো রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। ফাঙ্গাল ইনফেকশন কমাতে ও কাটা, ছড়া, ঘা সারাতেও অত্যন্ত দরকারী। হাতের কাছে তেজপাতা থাকলে তা দিলেই প্রাথমিক চিকিৎসা করে নিতে পারেন। তেজপাতা প্রদাহের বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি যেকোনো ধরনের মাথা ব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা এমনকি বাতের ব্যথা উপশমে কার্যকরী। তেজপাতা ও রেড়ির পাতার (ক্যাস্টর) পেস্ট আক্রান্ত স্থানে ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখলেই ব্যথা কমে যাবে। এছাড়া পাতার তেল কপালে ম্যাসাজ করলে মাথা ব্যথা থাকবে না। একটি গবেষণা অনুযায়ী তেজপাতা শরীরে ইউরিয়ার পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। শরীরে ইউরিয়ার পরিমাণ বেড়ে গেলে এটি কিডনির সমস্যা করে ও অন্যান্য গ্যাসের সমস্যা তৈরি করে। যদি দিনের শেষে আপনার মনমেজাজ ভালো না লাগে তাহলে এক কাপ তেজপাতার চা খেয়ে দেখতে পারেন। এটি আপনার স্নায়ু শান্ত করে ও উদ্বিগ্নতা কমায় এমনকি ভালো ঘুমের জন্যেও উপকারী। তেজপাতা বাড়ি থেকে পোকামাকড়ের উপদ্রবও দূর করে। পাতলা কাপড়ের পুঁটুলিতে বেঁধে তেজপাতা ও লবঙ্গ আটা বা ময়দার পাত্রে রেখে দিলে সবরকম পোকামাকড় দূরে থাকবে। তেজপাতায় আছে লিনালুন যৌগ। তাই তেজপাতা পোড়ানো হলে সেই গন্ধ থেরাপটিক উপকারিতা নিয়ে আসে। অ্যারোমাথেরাপিতে মানসিক চিন্তা, উদ্বেগ, ক্লান্তি কমায় তেজপাতার গন্ধ। মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায় তেজপাতার সুবাস থেকে। শীতকালে মশা ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের উপদ্রব বাড়তে পারে। সেই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে পেঁয়াজের খোসার সঙ্গে কিছু তেজপাতা পুড়িয়ে সেই ধোঁয়া ছড়িয়ে দিন বাড়ির বিভিন্ন অংশে। এই ধোঁয়ার গন্ধে মশা ও পোকামাকড়ের সমস্যা কমবে। বাড়ির বাগানের বিভিন্ন গাছে অনেক সময় পিঁপড়ে-সহ অন্য পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দেয়। সেক্ষেত্রেও টোটকা হিসেবে তেজপাতা ব্যবহার করুন। গাছের গোড়ায় তেজপাতা দিয়ে রাখলে কমবে সমস্যা। লেখকঃ মোঃ একরামুল হক উপাধ্যক্ষ দনিয়া কলেজ, ঢাকা। ২০ অক্টোবর ২০২৩