


মীর শাহাদাৎ,পাবনা :
পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প লোকসানের কারনে এখন বন্ধের পথে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ঘাটতি,দফায় দফায় রঙ ও সুতার দাম বৃদ্ধির সাথে উৎপাদিত কাপড়ের বাজার মুল্য হ্রাস পাওয়ায় লোকসানের কবলে পড়ে ইতিমধ্যেই পারিবারিক ঐতিহ্যগত এই পেশা ছেড়েছে জেলার দুই -তৃতীয়াংশ তাঁতী। বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের অনেকেই এখন গার্মেন্টস কর্মী, কেউ কেউ বেছে নিয়েছে মাছ ধরা, ভ্যান চালানো সহ দিনমজুরের কাজ। এছাড়াও তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় বিশ হাজার তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ফলে তাঁত পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় জৌলুসতা হাড়িয়েছে জেলার বৃহত্তর ও গুরুত্বপুর্ণ সব কাপড়ের হাঁট। যেকারণে ক্রমাগত বাড়ছে খেলাপী ঋণ, এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তাঁত বোর্ড। পাবনা জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া,ফরিদপুর,ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করে লক্ষ্য করা যায় তাঁত শিল্পের এই ভঙ্গুর দশা। অপরদিকে দেশের ঐতিহ্যগত ও রপ্তানিমুখী তাঁতশিল্প কে টিকিয়ে রাখতে প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারি প্রণোদনা (রঙ ও সুতা) ও বিনা সুদে সরকারি ঋণ সহায়তা প্রত্যাশা তাঁত মালিকদের।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সাঁথিয়া বেসিক সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় ১৭৮১ জন প্রান্তিক তাঁতীদের মাঝে ৩ কোটি ৫০ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা ঋন দেওয়া হয় যার মধ্যে ৭৬৯ জন সদস্য’র ১ কোটি ২৯ লক্ষ ৪ হাজার ৬০২ টাকা খেলাপী রয়েছে। এছাড়াও ২০২০ সালের ক্ষুদ্রঋন প্রকল্পের আওতায় ১৭৭ জন তাঁতী কে ১ কোটি ৯৭ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা ঋন বিতরণ করা হয় যার মধ্যে ৯৬ জন গ্রাহকের নিকট ৬৯ লক্ষ ৫৩ হাজার ৯৯৬ টাকা খেলাপী রয়েছে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সাব বেসিক সেন্টার দোগাছির তথ্যানুযায়ী ক্ষুদ্র ঋন প্রকল্পের আওতায় ১,২৮৭ জন তাঁতী কে ২ কোটি ২৬ লক্ষ ৭৯ হাজার ঋন দেওয়া হয়েছে যার ৬০ শতাংশ খেলাপী ঋণ। এছাড়াও চলতি মূলধন প্রকল্পের আওতায় ১০৪ জন গ্রাহকের মাঝে ১ কোটি ২৩ লক্ষ ২০ হাজার টাকা প্রদত্ত ঋণের ৫০ শতাংশের বেশি খেলাপী ঋণ যা আদায়ে রীতিমতো নাজেহাল অবস্থা তাঁত বোর্ডে কর্মরত কর্মকর্তা -কর্মচারীদের।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সাঁথিয়া বেসিক সেন্টার সুত্রে জানা যায়, পাবনার বেড়া,সাঁথিয়া ও সুজানগর এলাকায় তাঁতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০০৩ সালের তাঁত বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা ৫৫ হাজার ও বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা ২২ হাজার। এই তাঁতশিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ নারী -পুরুষ। এছাড়াও অন্যান্য ব্যবসা ও পেশার প্রায় ২০ হাজারের অধিক মানুষ এই তাঁতশিল্পের সাথে জড়িত।এই তাঁতশিল্প কে কেন্দ্র করে প্বার্শবর্তী সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর ও পাবনা জেলার আতাইকুলা বৃহত্তর কাপড়ের হাঁট গড়ে উঠেছে যা এই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। তবে কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসানে অর্থনৈতিক বিপ্লবের অন্যতম খাত পাবনার তাঁত শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাকসা গ্রামের একজন তাঁত মালিক জানান,এলাকায় একসময় প্রচুর দাপট ছিল, অনেক অসহায় মানুষকে সহায়তা করেছি। লোকসানে পড়ে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। নিঃস্ব অবস্থায় মানসম্মানের ভয়ে বাধ্য হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
বেড়া উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার পাঁচটি কারখানার ২০০টি তাঁত এখন বন্ধ রয়েছে। হাতিগাড়া এলাকার একজন তাঁতী জানান,দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবসায়ীক জীবনে এমন করুন অবস্থা আগে দেখি নি।গুদামে লাখ লাখ টাকার কাপড় পড়ে রয়েছে, কাপড় বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরীর টাকাই দিতে পারছি না। জমি বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছি। ৩০০টির বেশি তাঁতের মধ্যে মাত্র কয়েকটি তাঁত চালু রয়েছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স রায় ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জানান, শুল্কমুক্ত হওয়ায় চার বছর পুর্বে ৬টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আতাইকুলা ও শাহজাদপুর কাপড়ের হাঁট থেকে প্রতি সপ্তাহে ৪ লাখ পিচ শাড়ী -লুঙ্গী ভারতে রপ্তানি করতো। এছাড়াও মধ্যপাচ্য ও ইউরোপে পাবনায় উৎপাদিত কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। চার বছর ধরে বাংলাদেশী তাঁত জাত পণ্যে ভারতীয় শুল্ক আরোপ, ভারত ও বাংলাদেশে ডলারের মুল্যমানের ব্যবধানের কারণে রপ্তানির পরিমাণ অর্ধেকের অনেক নিচে নেমে এসেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বেসিক সেন্টার সাঁথিয়া’র অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত লিয়াজোঁ কর্মকর্তা বসুদেব চন্দ্র দাস বলেন, তাঁত শিল্প বন্ধ হওয়ার বড় অন্তরায় হচ্ছে তাঁতিদের উৎপাদিত পন্যের কাঁচামালের বাজার সংকট, উচ্চ মূল্য, দেশীয় বাজারে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মুল্য না পাওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক আরোপ। সম্ভাবনাময় তাঁতশিল্প কে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা উপরোক্ত সমস্যাগুলো উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। আশা করছি উচ্চ মহলের তৎপরতায় পাবনার তাঁতশিল্পে সুদিন ফিরবে।
মীর শাহাদাৎ হোসাইন
পাবনা
০১৭৪৫-৯৩৩৯৫৬