

বিনোদন ডেস্কঃ
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দুই বাংলার চলচ্চিত্র অঙ্গনকে যিনি অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছিলেন, তাঁরা হলেন বাংলাদেশের আনোয়ার হোসেন এবং কলকাতার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যদিও ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁরা দুজনেই দাপুটে নায়ক ছিলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাবা বা বয়োজ্যেষ্ঠ চরিত্রের আভিজাত্যকে তাঁরা যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা আজও অতুলনীয়।
আনোয়ার হোসেন: ঢাকাই সিনেমার ‘মুকুটহীন সম্রাট’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেন মানেই ছিল এক ধরণের নৈতিকতা ও আদর্শের প্রতীক। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি যে রাজকীয় পরিচিতি পেয়েছিলেন, পরবর্তীতে বাবা বা বড় ভাইয়ের চরিত্রে সেই গাম্ভীর্য বজায় রেখেছিলেন। তাঁর অভিনয় দক্ষতার মূল শক্তি ছিল তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং চোখের অভিব্যক্তি। তিনি যখন বড় পর্দায় আদর্শবাদী বাবার চরিত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন কিংবা সন্তানের জন্য হাহাকার করতেন, তখন দর্শকদের চোখে জল আসা ছিল অবধারিত। ‘লাঠিয়াল’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ কিংবা ‘ভাত দে’-এর মতো সিনেমায় তাঁর চরিত্রগুলো ছিল সমাজের বিবেক স্বরূপ। ঢালিউডে বাবার চরিত্রকে তিনি কেবল পার্শ্বচরিত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে গল্পের মূল কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: টলিউডের ধ্রুপদী বাতিঘর অন্যদিকে, কলকাতার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের মানসপুত্র। সৌমিত্রের অভিনয় দক্ষতা ছিল অত্যন্ত মার্জিত, শিক্ষিত এবং মননশীল। তিনি যখন নায়ক থেকে বাবার চরিত্রে উত্তীর্ণ হলেন, সেখানেও তিনি নিয়ে এলেন এক ধরণের আধুনিক আভিজাত্য। ‘বেলা শেষে’ বা ‘পোস্ত’র মতো সিনেমায় তিনি দেখিয়েছেন বাবা মানে কেবল শাসন নয়, বরং একরাশ নির্ভরতা এবং একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার কারণ ছিল তাঁর পরিমিত অভিনয়; তিনি কখনোই অতি-নাটকীয়তা পছন্দ করতেন না। তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণের যে ছন্দ, তা আজও যেকোনো নবীন অভিনেতার কাছে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গণ্য হয়।
পর্দার রসায়ন ও মিল: এই দুই কিংবদন্তির মধ্যে একটি বড় মিল ছিল—তাঁরা দুজনেই পর্দায় একটি ‘ভ্যালু সিস্টেম’ বা মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতেন। আনোয়ার হোসেন যেখানে ছিলেন গ্রাম-বাংলার আবেগপ্রবণ ও তেজি বাবার মুখচ্ছবি, সৌমিত্র সেখানে ছিলেন শহুরে মননশীল ও দার্শনিক বাবার প্রতিচ্ছবি। আনোয়ার হোসেনের সংলাপে থাকত বজ্রনির্ঘোষ, আর সৌমিত্রের সংলাপে থাকত বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা।
আজ তাঁরা কেউ বেঁচে নেই, কিন্তু দুই বাংলার সিনেমার স্বর্ণযুগের কথা উঠলে এই দুই ‘পিতা’র কথা শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হয়। তাঁরা শিখিয়ে গেছেন, চরিত্র ছোট বা বড় নয়, বরং অভিনয়ের নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো চরিত্র দিয়েই দর্শকের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকা সম্ভব।